নিউইয়র্ক ১১:০৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দশ বছরে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ বেড়েছে তিন গুণ, বকেয়া ১৪ লাখ কোটি টাকা

  • আপডেটের সময় : ১২:০৬:৪৪ অপরাহ্ণ, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
  • ১ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

গত এক দশকে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। ২০১৫ সালে দেশের বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ৩ হাজার ৮৭৭ কোটি ডলার। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ তা বেড়ে হয়েছে ১১ হাজার ৩৪৩ কোটি ডলার। ডলারের বিনিময়মূল্য ১২৫ টাকা ধরে হিসাব করলে টাকার অঙ্কে এই ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৪ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। 

বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেট রিপোর্ট ২০২৬’-এ বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দেশের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি বেড়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন ঋণ গ্রহণ, পুরোনো ঋণ পরিশোধ এবং অন্যান্য সমন্বয়ের পরও দেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। 

কোন খাতে ও কার কাছে কত ঋণ

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের বড় অংশ এসেছে বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ১১৪ কোটি ডলার। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের কাছে ২ হাজার ২৬৩ কোটি এবং এডিবির কাছে ১ হাজার ৭৫১ কোটি ডলার বকেয়া রয়েছে।

অন্যদিকে জাপান, চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতা দেশগুলোর কাছেও বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ঋণ রয়েছে। এসব দেশের কাছে মোট ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ২৬৪ কোটি ডলার। এর মধ্যে জাপানের কাছে ১ হাজার ২৭২ কোটি এবং রাশিয়ার কাছে ৯০২ কোটি ডলার পাওনা রয়েছে।

সরকারি ঋণের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার কোটি ডলার। এ ছাড়া স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ রয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি ডলার।


ঋণের পরিমাণ বাড়লেও পরিশোধ সক্ষমতার চিত্র কী

বিদেশি ঋণ বাড়লেও তা পরিশোধের সক্ষমতার কিছু সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে সহনীয় বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) তুলনায় বিদেশি ঋণের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২৪ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে এই হার বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ।

তবে রপ্তানি আয়ের বিপরীতে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের অনুপাত কমে ১৬ শতাংশে নেমেছে। আগের বছরের তুলনায় এই হার ৩ দশমিক ৮ শতাংশ কম। অর্থাৎ রপ্তানি থেকে অর্জিত প্রতি ১০০ ডলারের মধ্যে ১৬ ডলার ব্যয় হচ্ছে বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে। এই অনুপাত কমে আসাকে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।


১৪ বছরে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে চার গুণের বেশি

বিদেশি ঋণের স্থিতি বৃদ্ধির পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদেশি ঋণের বিপরীতে ১১০ কোটি ডলার পরিশোধ করেছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২০১ কোটি ডলারে। পরের অর্থবছর ২০২২-২৩ সালে তা প্রায় ৩০০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।

আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। ফলে ১৪ বছরের ব্যবধানে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে চার গুণেরও বেশি।


সামনে আরও বাড়তে পারে ঋণের কিস্তির চাপ

আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, বড় কয়েকটি অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পের ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের সময় এগিয়ে আসছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের ঋণের কিস্তি শিগগিরই পরিশোধ করতে হবে। এসব ঋণের অর্থের একটি বড় অংশ দিতে হবে জাপানকে। অন্যদিকে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেল ও মেট্রোরেল প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

প্রাক্‌-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে ৩০ কোটি ডলার দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক

যুক্তরাষ্ট্রের ‘দ্বিতীয় ওবামা’ জন ওসফ

০৭ নভেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

দশ বছরে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ বেড়েছে তিন গুণ, বকেয়া ১৪ লাখ কোটি টাকা

আপডেটের সময় : ১২:০৬:৪৪ অপরাহ্ণ, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

গত এক দশকে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। ২০১৫ সালে দেশের বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ৩ হাজার ৮৭৭ কোটি ডলার। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ তা বেড়ে হয়েছে ১১ হাজার ৩৪৩ কোটি ডলার। ডলারের বিনিময়মূল্য ১২৫ টাকা ধরে হিসাব করলে টাকার অঙ্কে এই ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৪ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। 

বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেট রিপোর্ট ২০২৬’-এ বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দেশের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি বেড়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন ঋণ গ্রহণ, পুরোনো ঋণ পরিশোধ এবং অন্যান্য সমন্বয়ের পরও দেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। 

কোন খাতে ও কার কাছে কত ঋণ

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের বড় অংশ এসেছে বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ১১৪ কোটি ডলার। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের কাছে ২ হাজার ২৬৩ কোটি এবং এডিবির কাছে ১ হাজার ৭৫১ কোটি ডলার বকেয়া রয়েছে।

অন্যদিকে জাপান, চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতা দেশগুলোর কাছেও বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ঋণ রয়েছে। এসব দেশের কাছে মোট ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ২৬৪ কোটি ডলার। এর মধ্যে জাপানের কাছে ১ হাজার ২৭২ কোটি এবং রাশিয়ার কাছে ৯০২ কোটি ডলার পাওনা রয়েছে।

সরকারি ঋণের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার কোটি ডলার। এ ছাড়া স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ রয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি ডলার।


ঋণের পরিমাণ বাড়লেও পরিশোধ সক্ষমতার চিত্র কী

বিদেশি ঋণ বাড়লেও তা পরিশোধের সক্ষমতার কিছু সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে সহনীয় বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) তুলনায় বিদেশি ঋণের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২৪ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে এই হার বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ।

তবে রপ্তানি আয়ের বিপরীতে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের অনুপাত কমে ১৬ শতাংশে নেমেছে। আগের বছরের তুলনায় এই হার ৩ দশমিক ৮ শতাংশ কম। অর্থাৎ রপ্তানি থেকে অর্জিত প্রতি ১০০ ডলারের মধ্যে ১৬ ডলার ব্যয় হচ্ছে বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে। এই অনুপাত কমে আসাকে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।


১৪ বছরে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে চার গুণের বেশি

বিদেশি ঋণের স্থিতি বৃদ্ধির পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদেশি ঋণের বিপরীতে ১১০ কোটি ডলার পরিশোধ করেছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২০১ কোটি ডলারে। পরের অর্থবছর ২০২২-২৩ সালে তা প্রায় ৩০০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।

আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। ফলে ১৪ বছরের ব্যবধানে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে চার গুণেরও বেশি।


সামনে আরও বাড়তে পারে ঋণের কিস্তির চাপ

আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, বড় কয়েকটি অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পের ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের সময় এগিয়ে আসছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের ঋণের কিস্তি শিগগিরই পরিশোধ করতে হবে। এসব ঋণের অর্থের একটি বড় অংশ দিতে হবে জাপানকে। অন্যদিকে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেল ও মেট্রোরেল প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

Share this news as a Photo Card