নিউইয়র্ক ০৫:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যেই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাচ্ছে মালয়েশিয়া

  • আপডেটের সময় : ০১:৫৯:৪১ অপরাহ্ণ, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৩ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সতর্কতার মধ্যেই প্রায় ১,৫০০ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো শুরু করেছে মালয়েশিয়া। দেশটির সরকার বলছে, তাদের প্রত্যাবাসন স্বেচ্ছায় হচ্ছে। তবে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরসহ বিভিন্ন সংগঠন বলছে, মিয়ানমারে এখনো নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফেরার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

মঙ্গলবার মালয়েশিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের লুমুত নৌঘাঁটির কাছে একটি স্টেডিয়ামে পুলিশি পাহারায় কয়েক ডজন বাস পৌঁছায়। এসব বাসে মিয়ানমারের নাগরিকরা ছিলেন। সাংবাদিকদের সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। পরে তাদের প্রক্রিয়াগত কাজ শেষ করে জাহাজে করে মিয়ানমারে পাঠানোর কথা রয়েছে।

মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রত্যাবাসনের জন্য দুটি মিয়ানমার নৌবাহিনীর জাহাজ ও একটি হাসপাতাল জাহাজ ব্যবহার করা হবে।

রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে দেশটির রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়ে আসছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালের ব্যাপক সামরিক অভিযানের পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে যায়। অনেক মানবাধিকার সংগঠন ওই অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছে।

মিয়ানমার এখনো রোহিঙ্গাদের নিজস্ব জাতিগত জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। বরং তাদের ‘বাঙালি’ বলে অভিহিত করে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় ১ লাখ ২৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী ছিল। বাংলাদেশে রয়েছে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা শরণার্থী জনগোষ্ঠী।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জুলাইয়ে জানিয়েছিলেন, মিয়ানমার ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে রাজি হয়েছে। মঙ্গলবার ফেরত পাঠানো প্রায় ১,৫০০ জন সেই তালিকার অংশ।

‘নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ নেই’

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, এই প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে তাদের কোনো ভূমিকা নেই।

সংস্থাটি বলেছে, মিয়ানমারে চলমান সংঘাত ও সহিংসতার কারণে সেখানে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে শরণার্থীদের ফিরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।

ইউএনএইচসিআরের মতে, কোনো শরণার্থীর প্রত্যাবাসন অবশ্যই স্বেচ্ছায়, পর্যাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে হতে হবে।

তবে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সতর্কতার বিষয়ে নতুন করে মন্তব্য না করে আগের বক্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করেছে—তাদের দাবি, প্রত্যাবাসন স্বেচ্ছায় হচ্ছে।

মানবাধিকারকর্মীরা অবশ্য প্রশ্ন তুলেছেন, আটক অবস্থায় থাকা শরণার্থীরা সত্যিকার অর্থে স্বাধীনভাবে দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন কি না।

‘এটি প্রত্যাবাসন নয়’

আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল কাউন্সিলের (এআরএনসি) সহসভাপতি নাই সান লুইন বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন এখনো শেষ হয়নি।

তার ভাষায়, এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো প্রত্যাবাসন নয়; বরং তাদের আবারও বিপদের মধ্যে পাঠানো।

তিনি মালয়েশিয়াকে মিয়ানমার নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো বন্ধ করার আহ্বান জানান।

তার দাবি, রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে এখনো তীব্র লড়াই চলছে। এর মধ্যে রোহিঙ্গারা দুই পক্ষের সংঘাতের মাঝখানে পড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের কক্সবাজারভিত্তিক সেন্টার ফর রোহিঙ্গা ক্রাইসিস স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান রো মায়ু ইসলামও বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসনের বিরোধিতা করেছেন।

তিনি বলেন, শুধু মালয়েশিয়ার আটককেন্দ্র থেকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিয়ে গেলেই সংকটের সমাধান হবে না। যেসব কারণে রোহিঙ্গারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল, সেসব সমস্যার সমাধান করতে হবে। এরপরই তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসন সম্ভব।

বিভিন্ন সংগঠনের আপত্তি

আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স (এমএসএফ) মালয়েশিয়াকে প্রত্যাবাসন বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে কাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে এবং তাদের প্রত্যেকের জন্য কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, তা প্রকাশ করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

এ ছাড়া ১৬০টির বেশি নাগরিক সংগঠন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের মধ্যে রোহিঙ্গাদের জোর করে সশস্ত্র গোষ্ঠীতে যুক্ত করা হতে পারে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বর্তমানে সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে লড়াই চলছে। এই অঞ্চল থেকেই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা অতীতে পালিয়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে।

মিয়ানমার বলছে, প্রত্যাবর্তন হবে নিরাপদ

মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের “নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ” প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে মালয়েশিয়ার যোগাযোগমন্ত্রী ফাহমি ফাদজিল বলেছেন, যাদের দেশে ফেরার পর নির্যাতন বা প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে, তাদের ফেরত পাঠানো হবে না। তবে ইতোমধ্যে যারা মিয়ানমারে ফিরে গেছেন, তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

২৫ বছর বয়সী ইসমাইল মালয়েশিয়ায় মাছের বাজারে কাজ করতেন। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার ও বৈরিতা বাড়ার পর তিনি কাজ ছেড়ে মিয়ানমারে ফিরে যান। এখন ইয়াঙ্গুনে বেকার অবস্থায় আত্মীয়দের ওপর নির্ভর করছেন। তার পূর্ণ নাগরিকত্বও নেই।

রাখাইনে থাকা এক রোহিঙ্গা কর্মী মোহাম্মদ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের এমন শরণার্থী শিবিরে পাঠানো হতে পারে, যেখানে এখনো সংঘাত ও রোগের ঝুঁকি রয়েছে।

মালয়েশিয়ায়ও বাড়ছে চাপ

মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের ওপর চাপও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। জুলাইয়ে পেনাংয়ের একটি অনানুষ্ঠানিক বসতি থেকে উচ্ছেদের মুখে কুয়ালালামপুরে ইউএনএইচসিআর কার্যালয়ের সামনে জড়ো হওয়া ১০০ জনের বেশি রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছিল। পরে তারা ইউএন-সংক্রান্ত নথি বহন করছেন বলে নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

মালয়েশিয়া ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের অংশীদার নয় এবং দেশটিতে শরণার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যবস্থাও নেই।

এদিকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছেন, তিনি মিয়ানমারের সামরিক সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইংকে মালয়েশিয়ায় আমন্ত্রণ জানাতে চান। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর সামরিক অভিযানের সময়ও তিনি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন।

আনোয়ারের লক্ষ্য, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া। তবে জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রশ্ন—মিয়ানমারে নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না করে এই প্রত্যাবাসন কতটা নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক হবে?

সূত্র : আল-জাজিরা 

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

সোমালিয়ায় জিম্মি ট্যাংকারে ৫ নাবিককে হত্যা, ১৬ জন আটক

নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যেই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাচ্ছে মালয়েশিয়া

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যেই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাচ্ছে মালয়েশিয়া

আপডেটের সময় : ০১:৫৯:৪১ অপরাহ্ণ, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সতর্কতার মধ্যেই প্রায় ১,৫০০ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো শুরু করেছে মালয়েশিয়া। দেশটির সরকার বলছে, তাদের প্রত্যাবাসন স্বেচ্ছায় হচ্ছে। তবে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরসহ বিভিন্ন সংগঠন বলছে, মিয়ানমারে এখনো নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফেরার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

মঙ্গলবার মালয়েশিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের লুমুত নৌঘাঁটির কাছে একটি স্টেডিয়ামে পুলিশি পাহারায় কয়েক ডজন বাস পৌঁছায়। এসব বাসে মিয়ানমারের নাগরিকরা ছিলেন। সাংবাদিকদের সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। পরে তাদের প্রক্রিয়াগত কাজ শেষ করে জাহাজে করে মিয়ানমারে পাঠানোর কথা রয়েছে।

মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রত্যাবাসনের জন্য দুটি মিয়ানমার নৌবাহিনীর জাহাজ ও একটি হাসপাতাল জাহাজ ব্যবহার করা হবে।

রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে দেশটির রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়ে আসছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালের ব্যাপক সামরিক অভিযানের পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে যায়। অনেক মানবাধিকার সংগঠন ওই অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছে।

মিয়ানমার এখনো রোহিঙ্গাদের নিজস্ব জাতিগত জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। বরং তাদের ‘বাঙালি’ বলে অভিহিত করে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় ১ লাখ ২৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী ছিল। বাংলাদেশে রয়েছে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা শরণার্থী জনগোষ্ঠী।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জুলাইয়ে জানিয়েছিলেন, মিয়ানমার ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে রাজি হয়েছে। মঙ্গলবার ফেরত পাঠানো প্রায় ১,৫০০ জন সেই তালিকার অংশ।

‘নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ নেই’

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, এই প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে তাদের কোনো ভূমিকা নেই।

সংস্থাটি বলেছে, মিয়ানমারে চলমান সংঘাত ও সহিংসতার কারণে সেখানে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে শরণার্থীদের ফিরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।

ইউএনএইচসিআরের মতে, কোনো শরণার্থীর প্রত্যাবাসন অবশ্যই স্বেচ্ছায়, পর্যাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে হতে হবে।

তবে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সতর্কতার বিষয়ে নতুন করে মন্তব্য না করে আগের বক্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করেছে—তাদের দাবি, প্রত্যাবাসন স্বেচ্ছায় হচ্ছে।

মানবাধিকারকর্মীরা অবশ্য প্রশ্ন তুলেছেন, আটক অবস্থায় থাকা শরণার্থীরা সত্যিকার অর্থে স্বাধীনভাবে দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন কি না।

‘এটি প্রত্যাবাসন নয়’

আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল কাউন্সিলের (এআরএনসি) সহসভাপতি নাই সান লুইন বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন এখনো শেষ হয়নি।

তার ভাষায়, এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো প্রত্যাবাসন নয়; বরং তাদের আবারও বিপদের মধ্যে পাঠানো।

তিনি মালয়েশিয়াকে মিয়ানমার নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো বন্ধ করার আহ্বান জানান।

তার দাবি, রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে এখনো তীব্র লড়াই চলছে। এর মধ্যে রোহিঙ্গারা দুই পক্ষের সংঘাতের মাঝখানে পড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের কক্সবাজারভিত্তিক সেন্টার ফর রোহিঙ্গা ক্রাইসিস স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান রো মায়ু ইসলামও বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসনের বিরোধিতা করেছেন।

তিনি বলেন, শুধু মালয়েশিয়ার আটককেন্দ্র থেকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিয়ে গেলেই সংকটের সমাধান হবে না। যেসব কারণে রোহিঙ্গারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল, সেসব সমস্যার সমাধান করতে হবে। এরপরই তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসন সম্ভব।

বিভিন্ন সংগঠনের আপত্তি

আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স (এমএসএফ) মালয়েশিয়াকে প্রত্যাবাসন বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে কাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে এবং তাদের প্রত্যেকের জন্য কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, তা প্রকাশ করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

এ ছাড়া ১৬০টির বেশি নাগরিক সংগঠন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের মধ্যে রোহিঙ্গাদের জোর করে সশস্ত্র গোষ্ঠীতে যুক্ত করা হতে পারে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বর্তমানে সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে লড়াই চলছে। এই অঞ্চল থেকেই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা অতীতে পালিয়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে।

মিয়ানমার বলছে, প্রত্যাবর্তন হবে নিরাপদ

মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের “নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ” প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে মালয়েশিয়ার যোগাযোগমন্ত্রী ফাহমি ফাদজিল বলেছেন, যাদের দেশে ফেরার পর নির্যাতন বা প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে, তাদের ফেরত পাঠানো হবে না। তবে ইতোমধ্যে যারা মিয়ানমারে ফিরে গেছেন, তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

২৫ বছর বয়সী ইসমাইল মালয়েশিয়ায় মাছের বাজারে কাজ করতেন। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার ও বৈরিতা বাড়ার পর তিনি কাজ ছেড়ে মিয়ানমারে ফিরে যান। এখন ইয়াঙ্গুনে বেকার অবস্থায় আত্মীয়দের ওপর নির্ভর করছেন। তার পূর্ণ নাগরিকত্বও নেই।

রাখাইনে থাকা এক রোহিঙ্গা কর্মী মোহাম্মদ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের এমন শরণার্থী শিবিরে পাঠানো হতে পারে, যেখানে এখনো সংঘাত ও রোগের ঝুঁকি রয়েছে।

মালয়েশিয়ায়ও বাড়ছে চাপ

মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের ওপর চাপও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। জুলাইয়ে পেনাংয়ের একটি অনানুষ্ঠানিক বসতি থেকে উচ্ছেদের মুখে কুয়ালালামপুরে ইউএনএইচসিআর কার্যালয়ের সামনে জড়ো হওয়া ১০০ জনের বেশি রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছিল। পরে তারা ইউএন-সংক্রান্ত নথি বহন করছেন বলে নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

মালয়েশিয়া ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের অংশীদার নয় এবং দেশটিতে শরণার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যবস্থাও নেই।

এদিকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছেন, তিনি মিয়ানমারের সামরিক সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইংকে মালয়েশিয়ায় আমন্ত্রণ জানাতে চান। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর সামরিক অভিযানের সময়ও তিনি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন।

আনোয়ারের লক্ষ্য, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া। তবে জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রশ্ন—মিয়ানমারে নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না করে এই প্রত্যাবাসন কতটা নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক হবে?

সূত্র : আল-জাজিরা 

Share this news as a Photo Card