ঢাকার আশপাশের উপশহর এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন ও শক্তিশালী করতে ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এ অর্থের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যিক এলাকা ও আবাসিক গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা, দক্ষতা ও সহনশীলতা বাড়ানো হবে।
‘পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট’ বা বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন নামে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডকে (বিআরইবি) সহায়তা করবে এডিবি। প্রকল্পের আওতায় ঢাকার আশপাশের দ্রুত বর্ধনশীল শিল্প ও শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সেবা দেওয়া ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পিবিএস) বিতরণ অবকাঠামো উন্নত করা হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এসব এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও নির্ভরযোগ্যতা উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এডিবির সহায়তায় পরিচালিত ‘ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট’ উদ্যোগের অধীনে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করে এমন সমস্যা যেমন- ওভারলোড হওয়া সাবস্টেশন, পুরোনো অবকাঠামো, সিস্টেম লস এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলা করবে।
বাংলাদেশে এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর চিংফেং ঝাং বলেন, ‘বাংলাদেশ যখন আরও সমৃদ্ধ, সহনশীল ও বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি হয়ে ওঠার ভিশন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে আধুনিক বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক অপরিহার্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী অবকাঠামো ও বর্ধিত সহনশীলতামূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে এই প্রকল্প ঢাকার চারপাশের গুরুত্বপূর্ণ করিডোরগুলোতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে ভবিষ্যতের জন্য উপযোগী করে তুলতে সাহায্য করবে। এর মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষ যেন তাদের প্রয়োজনীয় নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ পায়, তা নিশ্চিত করা হবে।’
এই প্রকল্পের মাধ্যমে ৫২টি সাবস্টেশনে ১,১৫০ মেগাভোল্ট-অ্যাম্পিয়ার ক্ষমতার নতুন ট্রান্সফরমার যুক্ত করা হবে এবং বিদ্যমান ১২টি সাবস্টেশনের সক্ষমতা ১১৫ মেগাভোল্ট-অ্যাম্পিয়ার বাড়ানো হবে। এছাড়া ২,৬০০ কিলোমিটারের বেশি ওভারহেড ও আন্ডারগ্রাউন্ড বিতরণ লাইন নির্মাণ ও সংস্কার করা হবে এবং নেটওয়ার্কের নির্ভরযোগ্যতা, দক্ষতা ও নিরাপত্তা বাড়াতে ইনসুলেটেড কন্ডাক্টর স্থাপন করা হবে।
সিস্টেম অপারেশন আধুনিকীকরণে নদী পারাপারের ট্রান্সমিশন স্ট্রাকচার ও সুইচিং স্টেশন তৈরি করা হবে এবং দ্রুত ত্রুটি শনাক্তকরণ ও পরিষেবা পুনরুদ্ধারের জন্য ৯০০টি ‘ফল্ট লোকেটর সেট’ স্থাপন করা হবে।
২০২২ সালে বাংলাদেশ শতভাগ বিদ্যুতায়নের লক্ষ্য অর্জন করলেও দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে, যা বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এই প্রকল্পটি ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে বিতরণ ব্যবস্থার সক্ষমতা জোরদার করার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ-সহনশীল ও স্বল্প-কার্বন নিঃসরণকারী উন্নয়নের লক্ষ্যে সহায়তা করবে।
এই প্রকল্পের জন্য এডিবির বিশেষ ‘রেজিলিয়েন্স ফাইন্যান্সিং’ বা দুর্যোগ-সহনশীলতা বিষয়ক অর্থায়নের পরিমাণ ১৪৬.৫২ মিলিয়ন ডলার। এর আওতায় পরিবেশবান্ধব ‘গ্যাস-ইনসুলেটেড সুইচগিয়ার’ প্রযুক্তির মতো অভিযোজন-সহায়ক ব্যবস্থার জন্য সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে; যা উন্নত বিতরণ দক্ষতা ও কারিগরি অপচয় হ্রাসের মাধ্যমে বার্ষিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ প্রায় ২,০৩,৭৫১ টন (কার্বন-ডাই-অক্সাইড সমতুল্য) কমাতে সহায়তা করবে।
প্রকল্পটি ডিজিটাল সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন, সাইবার নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ-সহনশীল কার্যক্রম পরিচালনা, পরিবেশগত ও সামাজিক সুরক্ষা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিআরইবি ও পিবিএস -গুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। পিবিএস-গুলোর আর্থিক স্থায়িত্ব জোরদার করার মাধ্যমে এটি বেসরকারি খাতের অধিকতর অংশগ্রহণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়তা করবে। এছাড়া প্রকল্পটি নারী ও মেয়েদের চাহিদার প্রতি সংবেদনশীল বিভিন্ন কার্যক্রমকে উৎসাহিত করবে, যার মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষেত্রের পরিবেশের উন্নয়ন।
এডিবির এই সহায়তার পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার ১০৭.৯৫ মিলিয়ন ডলার এবং বিআরইবি ১৪১.৩৯ মিলিয়ন ডলার সহ-অর্থায়ন করবে। এছাড়া এডিবির পরিচালিত ‘রিপাবলিক অব কোরিয়া ই-এশিয়া অ্যান্ড নলেজ পার্টনারশিপ ফান্ড’ থেকে পাওয়া ১ মিলিয়ন ডলারের কারিগরি সহায়তা অনুদান প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন, আর্থিক স্থায়িত্ব পরিকল্পনা এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তির বাস্তবায়নে ব্যয় করা হবে।


























