সন্তান জন্মের পর কত দ্রুত আগের শারীরিক গড়নে ফিরলেন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারকাদের নিয়ে এমন আলোচনা প্রায়ই দেখা যায়। বিশেষ করে সেলিব্রেটিদের ওজন, চেহারা ও শরীরের গড়ন নিয়ে মুহূর্তেই শুরু হয় তুলনা ও মন্তব্য। সন্তান জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই আগের মতো ছিপছিপে হয়ে ওঠাকে অনেকের কাছে যেন স্বাভাবিক প্রত্যাশা হিসেবে দেখা হয়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টি এতটা সরল নয়।
ভারতের গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. কিরণ কোয়েলহোর মতে, সন্তান জন্মের পর দ্রুত আগের শারীরিক অবস্থায় ফিরে আসার ‘বাউন্স ব্যাক’ ধারণাটি বাস্তবসম্মত নয়। গর্ভাবস্থা ও প্রসবের পর শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া প্রয়োজন।
কেন তারকাদের ওপর চাপ বেশি
সন্তান জন্মের পর তারকাদের শরীর নিয়ে মন্তব্য ও সমালোচনার মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের চেহারা ও ওজন নিয়ে দ্রুত আলোচনা শুরু হয়। অথচ গর্ভাবস্থায় নারীর শরীরে ব্যাপক শারীরিক ও হরমোনজনিত পরিবর্তন ঘটে। তাই সন্তান জন্মের পর আগের অবস্থায় ফিরতে সময় লাগা স্বাভাবিক।
ডা. কোয়েলহোর মতে, গর্ভাবস্থার আগের ওজনে ফিরতে অন্তত ছয় মাস সময় লাগতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশি সময় প্রয়োজন হতে পারে।
প্রথম ছয় মাস পুনরুদ্ধারের সময়
সন্তান জন্মের পর প্রথম ছয় সপ্তাহ বা প্রায় ৪০ দিনকে শরীরের পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে দেখা হয়। এ সময়ে হরমোনের পরিবর্তন, স্তন্যপান এবং প্রসব-পরবর্তী বিভিন্ন শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নিতে হয়।
গর্ভাবস্থায় আকারে বড় হয়ে যাওয়া জরায়ুকেও ধীরে ধীরে আগের অবস্থায় ফিরতে হয়। ফলে সন্তান জন্মের পরপরই শরীরকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য চাপ দেওয়া ঠিক নয়।
পেটের পেশি স্বাভাবিক হতেও সময় লাগে
গর্ভাবস্থায় শিশুর বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পেটের দেয়ালের পেশি প্রসারিত হয়। একই সময়ে পেলভিক-ফ্লোরের পেশির দৃঢ়তাও কমে যেতে পারে। সন্তান জন্মের পর এসব পেশির স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময় প্রয়োজন হয়।
এ কারণেই অনেক নারীর সন্তান জন্মের পর পেটের অংশ আগের তুলনায় কিছুটা বড় দেখাতে পারে। এটি সবসময় অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়।
ছয় মাসেও ওজন না কমলে কি অস্বাভাবিক?
সন্তান জন্মের পর শরীরে কিছু বাড়তি ওজন থেকে যাওয়া স্বাভাবিক হতে পারে। ডা. কোয়েলহোর মতে, গর্ভাবস্থার আগের ওজনে ফিরতে ছয় মাসের বেশি সময়ও লাগতে পারে। এমনকি সন্তান জন্মের এক বছর পরও কারও শরীরে এক থেকে দুই কেজি বাড়তি ওজন থাকতে পারে।
হরমোনের পরিবর্তন, ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া, ঘুমের ঘাটতি, মানসিক চাপ এবং শারীরিক কার্যকলাপ কমে যাওয়ার মতো বিভিন্ন কারণ এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
স্তন্যপানে বাড়তে পারে ক্ষুধা
সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় মায়ের শরীরে অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন হয়। ফলে এ সময়ে ক্ষুধা বেড়ে যেতে পারে। পাশাপাশি শিশুকে প্রতি দুই থেকে তিন ঘণ্টা পরপর খাওয়ানোর কারণে মায়ের ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
ঘুমের ঘাটতি, মানসিক চাপ ও শারীরিক কার্যকলাপ কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো একসঙ্গে ওজন কমানোর প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘পারফেক্ট বডি’ চাপ
আগে সন্তান জন্মের পর নারীর শরীর নিয়ে প্রশ্ন বা মন্তব্যের পরিধি ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে সেই চাপ এখন অনেক বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তারকাদের ক্ষেত্রে শরীর নিয়ে মন্তব্য ও তুলনা আরও বেশি দৃশ্যমান হয়।
কিন্তু গর্ভাবস্থার পর শরীরকে আগের মতো দেখতে হবেই—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। দ্রুত আগের চেহারায় ফিরে আসার চাপ সদ্য মা হওয়া নারীর জন্য বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
ব্যায়াম শুরুতেও তাড়াহুড়ো নয়
ডা. কোয়েলহোর মতে, সন্তান জন্মের পর প্রথম ছয় সপ্তাহ মূলত শরীরের পুনরুদ্ধারের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। এরপর শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ধীরে ধীরে ব্যায়াম শুরু করা যেতে পারে।
তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে অনেক নারী পর্যায়ক্রমে মাঝারি মাত্রার ব্যায়ামে ফিরতে পারেন। তবে কঠোর কোর এক্সারসাইজ বা ভারোত্তোলন শুরুর ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো না করাই ভালো।
শুধু ওজন নয়, নজর দিতে হবে অন্য স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও
সন্তান জন্মের পর শুধু ওজন কমানোর দিকে মনোযোগ না দিয়ে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যগত বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা, থাইরয়েডের সমস্যা, রক্তস্বল্পতা এবং পেলভিক-ফ্লোরের সমস্যা।
গর্ভাবস্থায় যাদের জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস ছিল, তাদেরও পরবর্তী সময়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণে থাকা প্রয়োজন।
‘আগের চেহারায় ফেরার’ নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই
ডা. কোয়েলহোর মতে, সন্তান জন্মের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মায়ের শারীরিক পুনরুদ্ধার, পুষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য, স্তন্যপান এবং সামগ্রিক সুস্থতা। গর্ভাবস্থার আগের চেহারায় ফিরে আসার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা থাকা উচিত নয়।
প্রতিটি নারীর শরীর সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া আলাদা। তাই সদ্য মা হওয়া একজন নারীর জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন শরীরকে পর্যাপ্ত সময় দিয়ে সেরে ওঠার সুযোগ দেওয়া—নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আগের চেহারায় ফিরে আসার চাপ নয়।


























