নিউইয়র্ক ০৭:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মুনাফা ছাড়ার শর্তে মিলছে মূল টাকা, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আমানতকারীদের ক্ষোভ

  • আপডেটের সময় : ০১:০৬:১০ অপরাহ্ণ, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৪ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে নিজেদের জমানো আমানতের মূল টাকা একবারে তুলে নিতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহকেরা। টাকা ফেরত পেতে আমানতকারীদের মুনাফা, সুদ ও যাবতীয় আর্থিক সুবিধার দাবি পরিত্যাগ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কোনো আইনি পদক্ষেপ বা মামলা না করার লিখিত অঙ্গীকারনামা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের এমন অন্যায্য ও একতরফা শর্তে গ্রাহকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

আর্থিক অনিয়ম ও চরম তারল্য সংকটে পড়া শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। চলতি বছরের ৭ সেপ্টেম্বর থেকে সরকারের উদ্যোগে এই ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।

ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, কোনো গ্রাহক তার মূল টাকা এককালীন একবারে তুলতে চাইলে তাঁকে দুই পৃষ্ঠার একটি বিশেষ ‘আবেদনপূর্বক অঙ্গীকারনামা’য় স্বাক্ষর করতে হচ্ছে। সেখানে বলা হয়েছে, মূলধন উত্তোলনের পর হিসাবটির ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি’ হয়ে যাবে। এর ফলে আমানতকারী কিংবা তাঁর নমিনি, উত্তরাধিকারী ও আইনগত প্রতিনিধি ভবিষ্যতে মুনাফা বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধার দাবি নিয়ে ব্যাংক বা কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো প্রকার অভিযোগ, দাবি, আবেদন কিংবা মামলা করতে পারবেন না। এই অঙ্গীকারনামায় আমানতকারীর নিজের স্বাক্ষরের পাশাপাশি দুজন সাক্ষীর স্বাক্ষরও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মাসের ১ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৮২ জন গ্রাহক মোট ৬ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা আমানত তুলে নেওয়ার আবেদন জমা দেন। এর মধ্যে ৯০ হাজার ৯৮ জন গ্রাহককে ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ব্যাংকটিতে নতুন আমানত এসেছে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং ৩২ হাজার ৭৪টি নতুন হিসাবের বিপরীতে জমা পড়েছে আরও ৩৭৮ কোটি টাকা।

উল্লেখ্য, গত ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক এক চিঠিতে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের স্থিতির ওপর দুই বছরের মুনাফা কেটে রাখার বা ‘হেয়ারকাট’ করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল। পরবর্তীতে তীব্র সমালোচনার মুখে গত ২৫ আগস্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, আমানতের ওপর কোনো হেয়ারকাট থাকছে না এবং ১ সেপ্টেম্বর থেকে মূল টাকা তোলা যাবে। তবে বাস্তবতা হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সেই আশ্বাসের পরও পুরো মূল টাকা একবারে তুলতে গিয়ে আমানতকারীদের সমস্ত মুনাফা ও ভবিষ্যতের আইনি প্রতিকার পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। ফলে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক বাধ্য হয়ে আবেদন করেও টাকা না তুলে ফিরে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, একীভূত ব্যাংকগুলো যাদের ঋণ দিয়েছিল, তারা মুনাফাসহ আসল অর্থ সময়মতো পরিশোধ না করায় ব্যাংকটি এখনো তারল্য সংকটে রয়েছে। ফলে যারা অতি জরুরি প্রয়োজনে এখনই টাকা তুলে নিচ্ছেন, তাদের মুনাফা ছাড়তে হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাকি গ্রাহকেরা মুনাফাসহ আমানত ফেরত পাবেন।

এদিকে মাঠপর্যায়ে ব্যাংকের শাখাগুলোর চরম অসহযোগিতা ও দীর্ঘসূত্রতায় গ্রাহকদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। জরুরি প্রয়োজনে আবেদন করার পরও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ঘোষিত তিন দিনের মধ্যে টাকা ছাড় মিলছে না বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। ২০-২৫ দিন ঘুরেও প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন না মেলা এবং হেয়ারকাট বাতিলের সার্কুলার না পৌঁছানোর অজুহাত দেখিয়ে শাখাগুলো হয়রানি করছে বলে গ্রাহকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ জানাচ্ছেন।

এরই মধ্যে গত সোমবার সব বিভাগীয় প্রধান ও শাখা ব্যবস্থাপকদের কাছে ব্যক্তিগত মেয়াদি ও স্কিমভিত্তিক আমানতের মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে চিঠি পাঠিয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, যদিও সেই মুনাফার হার এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। একই চিঠিতে যথাযথ কাগজপত্র যাচাই সাপেক্ষে মৃত গ্রাহকদের বৈধ দাবিদারদের অর্থ ফেরত দেওয়া এবং ব্লক করা হিসাবগুলো দ্রুত আনব্লক করে লেনদেনের উপযোগী করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

দক্ষিণের সীমানা পেরিয়ে এবার বাংলায় পা রাখল থালাপতি বিজয়ের দল

দক্ষিণ আফ্রিকায় ১১ নারীর মরদেহ উদ্ধার, বাড়ছে ‘সিরিয়াল কিলার’ আতঙ্ক

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

মুনাফা ছাড়ার শর্তে মিলছে মূল টাকা, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আমানতকারীদের ক্ষোভ

আপডেটের সময় : ০১:০৬:১০ অপরাহ্ণ, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে নিজেদের জমানো আমানতের মূল টাকা একবারে তুলে নিতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহকেরা। টাকা ফেরত পেতে আমানতকারীদের মুনাফা, সুদ ও যাবতীয় আর্থিক সুবিধার দাবি পরিত্যাগ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কোনো আইনি পদক্ষেপ বা মামলা না করার লিখিত অঙ্গীকারনামা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের এমন অন্যায্য ও একতরফা শর্তে গ্রাহকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

আর্থিক অনিয়ম ও চরম তারল্য সংকটে পড়া শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। চলতি বছরের ৭ সেপ্টেম্বর থেকে সরকারের উদ্যোগে এই ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।

ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, কোনো গ্রাহক তার মূল টাকা এককালীন একবারে তুলতে চাইলে তাঁকে দুই পৃষ্ঠার একটি বিশেষ ‘আবেদনপূর্বক অঙ্গীকারনামা’য় স্বাক্ষর করতে হচ্ছে। সেখানে বলা হয়েছে, মূলধন উত্তোলনের পর হিসাবটির ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি’ হয়ে যাবে। এর ফলে আমানতকারী কিংবা তাঁর নমিনি, উত্তরাধিকারী ও আইনগত প্রতিনিধি ভবিষ্যতে মুনাফা বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধার দাবি নিয়ে ব্যাংক বা কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো প্রকার অভিযোগ, দাবি, আবেদন কিংবা মামলা করতে পারবেন না। এই অঙ্গীকারনামায় আমানতকারীর নিজের স্বাক্ষরের পাশাপাশি দুজন সাক্ষীর স্বাক্ষরও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মাসের ১ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৮২ জন গ্রাহক মোট ৬ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা আমানত তুলে নেওয়ার আবেদন জমা দেন। এর মধ্যে ৯০ হাজার ৯৮ জন গ্রাহককে ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ব্যাংকটিতে নতুন আমানত এসেছে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং ৩২ হাজার ৭৪টি নতুন হিসাবের বিপরীতে জমা পড়েছে আরও ৩৭৮ কোটি টাকা।

উল্লেখ্য, গত ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক এক চিঠিতে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের স্থিতির ওপর দুই বছরের মুনাফা কেটে রাখার বা ‘হেয়ারকাট’ করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল। পরবর্তীতে তীব্র সমালোচনার মুখে গত ২৫ আগস্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, আমানতের ওপর কোনো হেয়ারকাট থাকছে না এবং ১ সেপ্টেম্বর থেকে মূল টাকা তোলা যাবে। তবে বাস্তবতা হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সেই আশ্বাসের পরও পুরো মূল টাকা একবারে তুলতে গিয়ে আমানতকারীদের সমস্ত মুনাফা ও ভবিষ্যতের আইনি প্রতিকার পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। ফলে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক বাধ্য হয়ে আবেদন করেও টাকা না তুলে ফিরে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, একীভূত ব্যাংকগুলো যাদের ঋণ দিয়েছিল, তারা মুনাফাসহ আসল অর্থ সময়মতো পরিশোধ না করায় ব্যাংকটি এখনো তারল্য সংকটে রয়েছে। ফলে যারা অতি জরুরি প্রয়োজনে এখনই টাকা তুলে নিচ্ছেন, তাদের মুনাফা ছাড়তে হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাকি গ্রাহকেরা মুনাফাসহ আমানত ফেরত পাবেন।

এদিকে মাঠপর্যায়ে ব্যাংকের শাখাগুলোর চরম অসহযোগিতা ও দীর্ঘসূত্রতায় গ্রাহকদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। জরুরি প্রয়োজনে আবেদন করার পরও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ঘোষিত তিন দিনের মধ্যে টাকা ছাড় মিলছে না বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। ২০-২৫ দিন ঘুরেও প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন না মেলা এবং হেয়ারকাট বাতিলের সার্কুলার না পৌঁছানোর অজুহাত দেখিয়ে শাখাগুলো হয়রানি করছে বলে গ্রাহকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ জানাচ্ছেন।

এরই মধ্যে গত সোমবার সব বিভাগীয় প্রধান ও শাখা ব্যবস্থাপকদের কাছে ব্যক্তিগত মেয়াদি ও স্কিমভিত্তিক আমানতের মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে চিঠি পাঠিয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, যদিও সেই মুনাফার হার এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। একই চিঠিতে যথাযথ কাগজপত্র যাচাই সাপেক্ষে মৃত গ্রাহকদের বৈধ দাবিদারদের অর্থ ফেরত দেওয়া এবং ব্লক করা হিসাবগুলো দ্রুত আনব্লক করে লেনদেনের উপযোগী করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

Share this news as a Photo Card