নিউইয়র্ক ১১:১৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘সার্বভৌমত্ব র‌্যালি’তে লাখো মানুষ নিয়ে সাত কিলোমিটার হাঁটলেন প্রধানমন্ত্রী

  • আপডেটের সময় : ০১:২২:৪৪ অপরাহ্ণ, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
  • ৫ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

শনিবার ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে বিএনপি চেয়ারম্যান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ‘সার্বভৌমত্ব র‌্যালি’ ঘিরে রাজধানীতে এক অভাবনীয় অদৃশ্যপূর্ব দৃশ্যপট রচিত হয়েছিল। অতীতে এমন দৃশ্য কেউ অবলোকন করেনি এই নগরীতে। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে কোনোকালেই এমন জন-জোয়ার দেখেনি কেউ। সব রাস্তাঘাট পথ-অলিগলি-সড়কমালা হতে ঊর্মিমুখর স্রোত মিশে গিয়েছিল তারেক রহমানের দৃঢ়-দৃপ্ত পদভারে উজ্জীবিত-উদ্দীপ্ত-উচ্ছ্বসিত সাত কিলোমিটার পথের জনসমুদ্রে। নয়াপল্টন থেকে কাকরাইল, রমনা পার্ক সড়ক, বাংলামোটর, কাওরান বাজার, ফার্মগেট হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের সুপ্রশস্ত মহাসড়ক অব্দি ছিল স্লোগানমুখর উত্তাল জনতায় একাকার। মুখে মুখে ছিল ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে সংশপ্তক স্লোগানধ্বনি।

পাঁচ দশক পূর্বে স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নস্যাৎ করে গোলামির জিঞ্জির পরানোর বহুমুখী ষড়যন্ত্রের নাগপাশ ছিন্ন করার ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরে তারই সুযোগ্য আত্মজ উত্তরসূরি তারেক রহমানের নেতৃত্বে গতকাল যে বুলন্দ আওয়াজ আর মানুষের সুদৃঢ় অব্যয় একতা রাজপথ উচ্চকিত করেছে তা ছড়িয়ে পড়েছে দেশময়; মানুষের প্রাণে প্রাণে। টানা সাত কিলোমিটার তারেক রহমানের দ্রুতলয়ে ক্ষিপ্রগতিতে বিরামহীন এক নাগাড়ে হাঁটার এই ভঙ্গি এবং হাসিমুখে উত্তোলিত হাতে অনবরত চতুষ্পার্শ্বের লোক সমাগমকে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন ছিল অবিকল শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের গ্রাম-গঞ্জে-মফস্বলে রাখাল রাজার মতো দ্রুত পদব্রজে চলার মতোই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো প্রধানমন্ত্রীর এমন একটানা দীর্ঘতম পদযাত্রার অকল্পনীয় নজিরবিহীন ইতিহাস রচনা করলেন তারেক রহমান। বিএনপি দীর্ঘ ২০ বছর পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর জাতীয় এই মহান দিবসটিতে অফুরন্ত আনন্দ উচ্ছ্বাস ও আবেগের আবর্তে ভাসিয়ে দিলেন তিনি।

নয়াপল্টনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে বেলা সাড়ে ৩টায় শুরু হওয়া সার্বভৌমত্ব র‌্যালিটি এক ঘণ্টা পর সাড়ে ৪টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে গিয়ে যখন সমাপ্ত করেন প্রধানমন্ত্রী তখনো শেষ প্রান্ত ছিল নয়াপল্টনে। সাম্প্রতিক সময়ে কোনো র‌্যালিতে এত বিপুল মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি।

এই র্যালি ঘিরে সকাল থেকেই ছোট ছোট মিছিল নিয়ে বিএনপি এবং তার অঙ্গ সংগঠনগুলো সমবেত হতে থাকেন নয়াপল্টনে মঞ্চের সমুখে। বেলা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে জমায়েতের পরিধি। তারেক রহমান পৌঁছানোর আগেই কাকরাইল মোড় থেকে শুরু করে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত লাখো নেতাকর্মী-সমর্থকে জনারণ্যে পরিগণিত হয়। নেতাকর্মীদের হাতে ছিল বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা এবং শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের আলোকচিত্র সংবলিত প্ল্যাকার্ড। বেলা ৩টায় প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে আরোহণ করে জনসমুদ্রের সমুখে দাঁড়িয়ে হাত উঁচিয়ে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। এ সময় নয়াপল্টন ও সন্নিহিত পুরো এলাকায়  স্লোগান নিনাদ আর উচ্ছ্বাসের ঢেউ তরঙ্গিত হতে থাকে। ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই, জিয়ার মুক্তি চাই’, ‘সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’— ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর রাজপথে উচ্চারিত এমন সব আবেগ মথিত স্লোগানধ্বনি আবারও শোনা গেল রাজপথে। হাস্যোজ্জ্বল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার সম্মোহনী বক্তৃতা শুরু করেন। ৯ মিনিটের ভাষণে তারেক রহমান ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের চেতনায় পতিত স্বৈরাচার ও তাদের দোসরদের ষড়যন্ত্রের বিষদাঁত উপড়ে ফেলার আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মতো দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষকে নিয়ে আমরা সব ষড়যন্ত্রের জবাব দেব। দেশে আবারও ষড়যন্ত্র হচ্ছে। কোনো ষড়যন্ত্র দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭ নভেম্বর হচ্ছে জাতীয় ঐক্যের দিন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষার দিন, বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের দিন। প্রধানমন্ত্রী নিজে স্লোগান ধরেন, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ। সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।’ তার স্লোগান একক কণ্ঠের নিনাদ উত্তাল জনসমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে দিক-বিদিক। এ সময় মানুষের ভেতর দেখা যায়  দিনটির ঐতিহাসিক স্মৃতি ও রাজনৈতিক অভূতপূর্ব আবেগ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা শুধু স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে ফিরিয়ে আনে নাই। দেশের মানুষ স্বৈরাচার, ষড়যন্ত্রকারীদের দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে। যেভাবে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেই অপশক্তি পরাজিত হয়েছিল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একইভাবে সেই অপশক্তি পরাজিত হয়েছে, দেশের মানুষের অংশগ্রহণে, আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। অতীতের মতো এখনো একটি পক্ষ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আবারও তারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ণ করতে চায়, আবার তারা আমি-ডামি নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু করতে চায়। এ সুযোগ আর দেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, যে দেশের মানুষ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করতে পারে, যে দেশের মানুষ ১৯৭৫ সালের সিপাহি-জনতার বিপ্লব ঘটাতে পারে, যে দেশের মানুষ ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে পারে, সে দেশের মানুষকে ষড়যন্ত্র করে দাবিয়ে রাখা যাবে না।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভাষণ শেষ করেই নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে ‘ঐতিহাসিক সার্বভৌমত্ব র‌্যালি’ শোভাযাত্রাটি শুরু করেন। সাদা হাফ হাতা শার্ট এবং গ্রে কালারের প্যান্ট আর পায়ে নেভি ব্লু কেডস পরিহিত তারেক রহমানের সঙ্গে ছিলেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আমানউল্লাহ আমান ও ফরহাদ হালিম ডোনার। এছাড়া, ভাইস চেয়ারম্যান ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, সংসদের হুইপ মিয়া নূরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম, বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, আব্দুস সালাম আজাদ, কোষাধ্যক্ষ রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, উত্তর সিটির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবীন, উত্তরের সদস্যসচিব এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, যুবদল সভাপতি মোনায়েম মুন্নাসহ দলের কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। পেছনে ছিল জনসমুদ্র।

প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখতে পুরো সড়কমালার দুই ধারে হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে প্রিয় প্রধানমন্ত্রীকে হাতে নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। উঁচু দালানগুলোতে উত্সুখ মানুষের ভিড় ছিল অভাবনীয়। সপ্রতিভ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হাস্যোজ্জ্বল অভিব্যক্তিতে দুই হাত নেড়ে শুভেচ্ছার জবাব দেন। প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত দৃপ্তপদে অবিরাম হাঁটার গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিলেন না সঙ্গে থাকা সিনিয়র নেতৃবৃন্দ। তাদেরকে রীতিমতো ক্লান্ত ও হিমশিম খেতে দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রীর সামনে থাকা যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল ও কৃষক দলের শীর্ষ নেতারাও তার একটানা হাঁটার ছন্দময় গতিতে তালহীন হয়ে পড়েন। কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে থাকা এই নেতাদের চেহারায়ও দীর্ঘ পথ চলার ক্লান্তি স্পষ্ট ছিল।

এদিকে বিএনপির স্বাধীনতা র‌্যালি ঘিরে যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে আশপাশের পুরো এলাকা জুড়ে ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নজরদারি। পাশাপাশি, রাস্তায় চলাচলের নিয়ম ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সচেষ্ট ছিলেন বিএনপির নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবীরাও। ফকিরাপুল, দৈনিক বাংলা, আরামবাগ, নাইটিংগেল মোড়, বিজয়নগর, কাকরাইল, শান্তিনগর ও মালিবাগ পর্যন্ত জনতার বিশাল স্রোত এই র‌্যালিকে এক ঐতিহাসিক জনসমুদ্রে রূপ দেয়।

বিকাল সাড়ে ৪টায় প্রধানমন্ত্রী নির্ধারিত সাত কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে এসে পৌঁছান এবং সেখানে সমাপনই বক্তব্য দেন। মন্ত্রীসভার সদস্যসহ সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই সম্পন্ন হয় এই ঐতিহাসিক শোভাযাত্রা।

সমাপনই বক্তব্যে যে কোনো মূল্যে দেশের সার্বভৌমত্ব ও বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। 

তিনি বলেন, দেশ স্বাধীনের পর থেকে যে মহল বাংলাদেশে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, মানুষের অধিকার, ভোটের অধিকার, কথা বলার অধিকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত জনগণ তাদের পরাজিত করেছে। আবারও তারা ষড়যন্ত্র নিয়ে মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে। আসুন, আজ এই জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, যে কোনো মূল্যে আমরা আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব এবং বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করব। এটাই হোক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের প্রতিজ্ঞা। 

এ সময় তিনি আরও বলেন, প্রিয় ভাই ও বোনেরা, যত দিন স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ থাকবে, তত দিন এই বিপ্লবের র্যালি চলমান থাকবে।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

‘পরাজিত ব্যক্তি’ বলতেই ক্ষুব্ধ হয়ে ব্রিফিং ছাড়লেন ট্রাম্প

বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল ইরানের কেশম দ্বীপ

০৮ নভেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

‘সার্বভৌমত্ব র‌্যালি’তে লাখো মানুষ নিয়ে সাত কিলোমিটার হাঁটলেন প্রধানমন্ত্রী

আপডেটের সময় : ০১:২২:৪৪ অপরাহ্ণ, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

শনিবার ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে বিএনপি চেয়ারম্যান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ‘সার্বভৌমত্ব র‌্যালি’ ঘিরে রাজধানীতে এক অভাবনীয় অদৃশ্যপূর্ব দৃশ্যপট রচিত হয়েছিল। অতীতে এমন দৃশ্য কেউ অবলোকন করেনি এই নগরীতে। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে কোনোকালেই এমন জন-জোয়ার দেখেনি কেউ। সব রাস্তাঘাট পথ-অলিগলি-সড়কমালা হতে ঊর্মিমুখর স্রোত মিশে গিয়েছিল তারেক রহমানের দৃঢ়-দৃপ্ত পদভারে উজ্জীবিত-উদ্দীপ্ত-উচ্ছ্বসিত সাত কিলোমিটার পথের জনসমুদ্রে। নয়াপল্টন থেকে কাকরাইল, রমনা পার্ক সড়ক, বাংলামোটর, কাওরান বাজার, ফার্মগেট হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের সুপ্রশস্ত মহাসড়ক অব্দি ছিল স্লোগানমুখর উত্তাল জনতায় একাকার। মুখে মুখে ছিল ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে সংশপ্তক স্লোগানধ্বনি।

পাঁচ দশক পূর্বে স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নস্যাৎ করে গোলামির জিঞ্জির পরানোর বহুমুখী ষড়যন্ত্রের নাগপাশ ছিন্ন করার ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরে তারই সুযোগ্য আত্মজ উত্তরসূরি তারেক রহমানের নেতৃত্বে গতকাল যে বুলন্দ আওয়াজ আর মানুষের সুদৃঢ় অব্যয় একতা রাজপথ উচ্চকিত করেছে তা ছড়িয়ে পড়েছে দেশময়; মানুষের প্রাণে প্রাণে। টানা সাত কিলোমিটার তারেক রহমানের দ্রুতলয়ে ক্ষিপ্রগতিতে বিরামহীন এক নাগাড়ে হাঁটার এই ভঙ্গি এবং হাসিমুখে উত্তোলিত হাতে অনবরত চতুষ্পার্শ্বের লোক সমাগমকে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন ছিল অবিকল শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের গ্রাম-গঞ্জে-মফস্বলে রাখাল রাজার মতো দ্রুত পদব্রজে চলার মতোই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো প্রধানমন্ত্রীর এমন একটানা দীর্ঘতম পদযাত্রার অকল্পনীয় নজিরবিহীন ইতিহাস রচনা করলেন তারেক রহমান। বিএনপি দীর্ঘ ২০ বছর পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর জাতীয় এই মহান দিবসটিতে অফুরন্ত আনন্দ উচ্ছ্বাস ও আবেগের আবর্তে ভাসিয়ে দিলেন তিনি।

নয়াপল্টনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে বেলা সাড়ে ৩টায় শুরু হওয়া সার্বভৌমত্ব র‌্যালিটি এক ঘণ্টা পর সাড়ে ৪টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে গিয়ে যখন সমাপ্ত করেন প্রধানমন্ত্রী তখনো শেষ প্রান্ত ছিল নয়াপল্টনে। সাম্প্রতিক সময়ে কোনো র‌্যালিতে এত বিপুল মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি।

এই র্যালি ঘিরে সকাল থেকেই ছোট ছোট মিছিল নিয়ে বিএনপি এবং তার অঙ্গ সংগঠনগুলো সমবেত হতে থাকেন নয়াপল্টনে মঞ্চের সমুখে। বেলা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে জমায়েতের পরিধি। তারেক রহমান পৌঁছানোর আগেই কাকরাইল মোড় থেকে শুরু করে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত লাখো নেতাকর্মী-সমর্থকে জনারণ্যে পরিগণিত হয়। নেতাকর্মীদের হাতে ছিল বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা এবং শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের আলোকচিত্র সংবলিত প্ল্যাকার্ড। বেলা ৩টায় প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে আরোহণ করে জনসমুদ্রের সমুখে দাঁড়িয়ে হাত উঁচিয়ে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। এ সময় নয়াপল্টন ও সন্নিহিত পুরো এলাকায়  স্লোগান নিনাদ আর উচ্ছ্বাসের ঢেউ তরঙ্গিত হতে থাকে। ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই, জিয়ার মুক্তি চাই’, ‘সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’— ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর রাজপথে উচ্চারিত এমন সব আবেগ মথিত স্লোগানধ্বনি আবারও শোনা গেল রাজপথে। হাস্যোজ্জ্বল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার সম্মোহনী বক্তৃতা শুরু করেন। ৯ মিনিটের ভাষণে তারেক রহমান ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের চেতনায় পতিত স্বৈরাচার ও তাদের দোসরদের ষড়যন্ত্রের বিষদাঁত উপড়ে ফেলার আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মতো দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষকে নিয়ে আমরা সব ষড়যন্ত্রের জবাব দেব। দেশে আবারও ষড়যন্ত্র হচ্ছে। কোনো ষড়যন্ত্র দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭ নভেম্বর হচ্ছে জাতীয় ঐক্যের দিন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষার দিন, বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের দিন। প্রধানমন্ত্রী নিজে স্লোগান ধরেন, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ। সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।’ তার স্লোগান একক কণ্ঠের নিনাদ উত্তাল জনসমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে দিক-বিদিক। এ সময় মানুষের ভেতর দেখা যায়  দিনটির ঐতিহাসিক স্মৃতি ও রাজনৈতিক অভূতপূর্ব আবেগ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা শুধু স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে ফিরিয়ে আনে নাই। দেশের মানুষ স্বৈরাচার, ষড়যন্ত্রকারীদের দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে। যেভাবে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেই অপশক্তি পরাজিত হয়েছিল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একইভাবে সেই অপশক্তি পরাজিত হয়েছে, দেশের মানুষের অংশগ্রহণে, আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। অতীতের মতো এখনো একটি পক্ষ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আবারও তারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ণ করতে চায়, আবার তারা আমি-ডামি নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু করতে চায়। এ সুযোগ আর দেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, যে দেশের মানুষ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করতে পারে, যে দেশের মানুষ ১৯৭৫ সালের সিপাহি-জনতার বিপ্লব ঘটাতে পারে, যে দেশের মানুষ ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে পারে, সে দেশের মানুষকে ষড়যন্ত্র করে দাবিয়ে রাখা যাবে না।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভাষণ শেষ করেই নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে ‘ঐতিহাসিক সার্বভৌমত্ব র‌্যালি’ শোভাযাত্রাটি শুরু করেন। সাদা হাফ হাতা শার্ট এবং গ্রে কালারের প্যান্ট আর পায়ে নেভি ব্লু কেডস পরিহিত তারেক রহমানের সঙ্গে ছিলেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আমানউল্লাহ আমান ও ফরহাদ হালিম ডোনার। এছাড়া, ভাইস চেয়ারম্যান ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, সংসদের হুইপ মিয়া নূরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম, বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, আব্দুস সালাম আজাদ, কোষাধ্যক্ষ রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, উত্তর সিটির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবীন, উত্তরের সদস্যসচিব এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, যুবদল সভাপতি মোনায়েম মুন্নাসহ দলের কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। পেছনে ছিল জনসমুদ্র।

প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখতে পুরো সড়কমালার দুই ধারে হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে প্রিয় প্রধানমন্ত্রীকে হাতে নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। উঁচু দালানগুলোতে উত্সুখ মানুষের ভিড় ছিল অভাবনীয়। সপ্রতিভ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হাস্যোজ্জ্বল অভিব্যক্তিতে দুই হাত নেড়ে শুভেচ্ছার জবাব দেন। প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত দৃপ্তপদে অবিরাম হাঁটার গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিলেন না সঙ্গে থাকা সিনিয়র নেতৃবৃন্দ। তাদেরকে রীতিমতো ক্লান্ত ও হিমশিম খেতে দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রীর সামনে থাকা যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল ও কৃষক দলের শীর্ষ নেতারাও তার একটানা হাঁটার ছন্দময় গতিতে তালহীন হয়ে পড়েন। কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে থাকা এই নেতাদের চেহারায়ও দীর্ঘ পথ চলার ক্লান্তি স্পষ্ট ছিল।

এদিকে বিএনপির স্বাধীনতা র‌্যালি ঘিরে যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে আশপাশের পুরো এলাকা জুড়ে ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নজরদারি। পাশাপাশি, রাস্তায় চলাচলের নিয়ম ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সচেষ্ট ছিলেন বিএনপির নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবীরাও। ফকিরাপুল, দৈনিক বাংলা, আরামবাগ, নাইটিংগেল মোড়, বিজয়নগর, কাকরাইল, শান্তিনগর ও মালিবাগ পর্যন্ত জনতার বিশাল স্রোত এই র‌্যালিকে এক ঐতিহাসিক জনসমুদ্রে রূপ দেয়।

বিকাল সাড়ে ৪টায় প্রধানমন্ত্রী নির্ধারিত সাত কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে এসে পৌঁছান এবং সেখানে সমাপনই বক্তব্য দেন। মন্ত্রীসভার সদস্যসহ সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই সম্পন্ন হয় এই ঐতিহাসিক শোভাযাত্রা।

সমাপনই বক্তব্যে যে কোনো মূল্যে দেশের সার্বভৌমত্ব ও বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। 

তিনি বলেন, দেশ স্বাধীনের পর থেকে যে মহল বাংলাদেশে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, মানুষের অধিকার, ভোটের অধিকার, কথা বলার অধিকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত জনগণ তাদের পরাজিত করেছে। আবারও তারা ষড়যন্ত্র নিয়ে মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে। আসুন, আজ এই জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, যে কোনো মূল্যে আমরা আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব এবং বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করব। এটাই হোক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের প্রতিজ্ঞা। 

এ সময় তিনি আরও বলেন, প্রিয় ভাই ও বোনেরা, যত দিন স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ থাকবে, তত দিন এই বিপ্লবের র্যালি চলমান থাকবে।

Share this news as a Photo Card