নিউইয়র্ক ১১:১৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২০২৭ সালে চুক্তিবদ্ধ এলএনজি কার্গোর ৬৫ শতাংশ সরবরাহ করবে কাতারএনার্জি

  • আপডেটের সময় : ০১:২৬:৩৬ অপরাহ্ণ, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
  • ৫ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

২০২৭ সালে বাংলাদেশের জন্য চুক্তিবদ্ধ ৪০টি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কার্গোর মধ্যে ২৬টি সরবরাহ করতে যাচ্ছে কাতারএনার্জি। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি তাদের বার্ষিক প্রতিশ্রুতির ৬৫ শতাংশ পূরণ করবে। কাতারের পাশাপাশি ওমানসহ অন্যান্য সরবরাহকারীর কাছ থেকেও গ্যাস পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় আপাতত আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত এলএনজি আমদানির সূচি চূড়ান্ত করার পথে হাঁটছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুরো বছরের আমদানি পরিকল্পনা এখনই চূড়ান্ত না করে মার্চ পর্যন্ত সরবরাহ সূচি তৈরির জন্য পেট্রোবাংলাকে নির্দেশ দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। সরবরাহ পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী সময়ে আমদানির পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে।

নীতিনির্ধারকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমতে পারে। এ নৌপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে এলএনজিবাহী জাহাজের পরিবহনও বাড়বে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহকারীরা পুনরায় বাংলাদেশে গ্যাস পাঠাতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা হলে বর্তমান সরবরাহ সংকট কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় অতিরিক্ত এলএনজি কার্গো পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এ কারণেই পুরো বছরের আমদানি সূচি আগেভাগে নির্ধারণ না করে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রাখতে চায় সরকার।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আন্তর্জাতিক এলএনজি সরবরাহব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দেয়। সংঘাতের প্রভাবে গ্যাস উৎপাদন এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হয়। কয়েকটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফোর্স ম্যাজিউর ঘোষণা করায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে গ্যাস সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এ পরিস্থিতির আগে ২০২৭ সালে প্রায় ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করেছিল বাংলাদেশ। এর মধ্যে অন্তত ১০৩টি কার্গো দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু চুক্তিবদ্ধ মোট ১২৮টি কার্গোর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৭১টির সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা।

কাতার ও ওমানের সরবরাহে অনিশ্চয়তা
২০২৭ সালে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে কাতারএনার্জি। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ৪০টি কার্গোর মধ্যে ২৬টি সরবরাহের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। অর্থাৎ মোট চুক্তির ৬৫ শতাংশ পূরণ করতে পারবে তারা।

কাতারএনার্জির সহযোগী প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি ট্রেডিং এলএলসি থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলএনজি পাওয়ার কথা রয়েছে। ২৪টি কার্গোর চুক্তির বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি ১৮টি সরবরাহ করবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা চুক্তির ৭৫ শতাংশ। দুই প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে আগামী বছর কাতারের কাছ থেকে মোট ৪৪টি কার্গো পেতে পারে বাংলাদেশ।

তবে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় কাতারএনার্জি ফোর্স ম্যাজিউর ঘোষণা করেছে। এর ফলে চুক্তি অনুযায়ী পূর্ণ ৪০টি কার্গো পাওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও সরবরাহ কমে আসছে।

অন্যদিকে, ওমানের রাষ্ট্রায়ত্ত এলএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওকিউ ট্রেডিংয়ের (ওকিউটি) কাছ থেকেও ২০২৭ সালে ৩২টি কার্গো পাওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কোনো কার্গোর সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি। বরং চুক্তির অর্ধেক, অর্থাৎ ১৬টি কার্গো সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে তারা।

ওকিউটির প্রস্তাবে মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি পরিবর্তনের বিষয়টিও রয়েছে। বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দামের সঙ্গে সম্পর্কিত পদ্ধতির পরিবর্তে জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) সূচক অনুসারে এলএনজির দাম নির্ধারণ করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। এ ক্ষেত্রে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটের (এমএমবিটিইউ) দাম জেকেএম সূচকের চেয়ে ০.০৪ ডলার কম রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে এ প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি পেট্রোবাংলা। প্রতিষ্ঠানটিকে বিদ্যমান চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সরবরাহ অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত মার্চে সরবরাহ সংকট শুরুর পর থেকেই ফোর্স ম্যাজিউর ঘোষণা দিয়ে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রেখেছে ওকিউটি।

গানভর ও টোটালএনার্জিসের কাছ থেকে আসবে ১৮ কার্গো
কাতার ও ওমানের বাইরে অন্যান্য সরবরাহকারীর কাছ থেকেও এলএনজি সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশের। এর অংশ হিসেবে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান গানভর ইউএসএ এলএলসি থেকে ২০২৭ সালে ছয়টি কার্গো পাওয়ার কথা রয়েছে।

২০২৬ থেকে ২০৩৮ সালের মধ্যে মোট ১১৭টি কার্গো সরবরাহের লক্ষ্যে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ১৩ বছর মেয়াদি চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। চুক্তির প্রথম পর্যায়ে ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে জেকেএম সূচকভিত্তিক মোট ১৪টি কার্গো সরবরাহ করবে গানভর। এর মধ্যে ২০২৬ সালে পাঁচটি, ২০২৭ সালে ছয়টি এবং ২০২৮ সালে তিনটি কার্গো পাওয়ার কথা রয়েছে। ২০২৭ সালের ছয়টি কার্গোর প্রতি এমএমবিটিইউর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে জেকেএম সূচকের সঙ্গে অতিরিক্ত ০.০৮৭৫ ডলার যোগ করে।

চুক্তির অবশিষ্ট ১০৩টি কার্গো ২০২৮ থেকে ২০৩৮ সালের মধ্যে সরবরাহ করা হবে। এসব কার্গোর মূল্য নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের হেনরি হাব সূচকের ১২১ শতাংশের সঙ্গে ৫.২০ ডলার যোগ করার শর্ত রাখা হয়েছে।

এদিকে, ফ্রান্সভিত্তিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান টোটালএনার্জিসের কাছ থেকে ২০২৭ সালে ১২টি কার্গো পাওয়ার প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত মোট ১৮টি কার্গো সরবরাহের জন্য প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সম্প্রতি স্বল্পমেয়াদি চুক্তি হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম হবে জেকেএম সূচকের সঙ্গে অতিরিক্ত ০.০৬ ডলার যোগ করে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এক্সেলেরেট গ্যাসের কাছ থেকে ২০২৭ সালে ১৪টি কার্গো পাওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত নয়টির সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, রিগ্যাসিফিকেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর প্রতিটি এলএনজি কার্গো থেকে প্রায় ২ হাজার ৯০০ থেকে ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়া যায়।

স্পট মার্কেটনির্ভরতায় বাড়ছে ভর্তুকির চাপ
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। স্পট মার্কেটে তুলনামূলক বেশি দামে গ্যাস কিনতে হওয়ায় আমদানি ব্যয়ও বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ের ওপর।

জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকি হিসেবে সরকারের ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতা এবং সরবরাহ সংকটের মধ্যে দেশের গ্যাসের চাহিদা মেটাতে গিয়ে এ বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে সরকারকে।

এ অবস্থায় আপাতত আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত এলএনজি আমদানির সূচি নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে মিল রেখে সরবরাহকারীদের প্রতিশ্রুতি ও দেশের আমদানির প্রয়োজনীয়তা নতুন করে পর্যালোচনা করতে পারবে পেট্রোবাংলা।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

‘পরাজিত ব্যক্তি’ বলতেই ক্ষুব্ধ হয়ে ব্রিফিং ছাড়লেন ট্রাম্প

বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল ইরানের কেশম দ্বীপ

০৮ নভেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

২০২৭ সালে চুক্তিবদ্ধ এলএনজি কার্গোর ৬৫ শতাংশ সরবরাহ করবে কাতারএনার্জি

আপডেটের সময় : ০১:২৬:৩৬ অপরাহ্ণ, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

২০২৭ সালে বাংলাদেশের জন্য চুক্তিবদ্ধ ৪০টি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কার্গোর মধ্যে ২৬টি সরবরাহ করতে যাচ্ছে কাতারএনার্জি। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি তাদের বার্ষিক প্রতিশ্রুতির ৬৫ শতাংশ পূরণ করবে। কাতারের পাশাপাশি ওমানসহ অন্যান্য সরবরাহকারীর কাছ থেকেও গ্যাস পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় আপাতত আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত এলএনজি আমদানির সূচি চূড়ান্ত করার পথে হাঁটছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুরো বছরের আমদানি পরিকল্পনা এখনই চূড়ান্ত না করে মার্চ পর্যন্ত সরবরাহ সূচি তৈরির জন্য পেট্রোবাংলাকে নির্দেশ দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। সরবরাহ পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী সময়ে আমদানির পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে।

নীতিনির্ধারকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমতে পারে। এ নৌপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে এলএনজিবাহী জাহাজের পরিবহনও বাড়বে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহকারীরা পুনরায় বাংলাদেশে গ্যাস পাঠাতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা হলে বর্তমান সরবরাহ সংকট কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় অতিরিক্ত এলএনজি কার্গো পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এ কারণেই পুরো বছরের আমদানি সূচি আগেভাগে নির্ধারণ না করে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রাখতে চায় সরকার।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আন্তর্জাতিক এলএনজি সরবরাহব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দেয়। সংঘাতের প্রভাবে গ্যাস উৎপাদন এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হয়। কয়েকটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফোর্স ম্যাজিউর ঘোষণা করায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে গ্যাস সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এ পরিস্থিতির আগে ২০২৭ সালে প্রায় ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করেছিল বাংলাদেশ। এর মধ্যে অন্তত ১০৩টি কার্গো দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু চুক্তিবদ্ধ মোট ১২৮টি কার্গোর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৭১টির সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা।

কাতার ও ওমানের সরবরাহে অনিশ্চয়তা
২০২৭ সালে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে কাতারএনার্জি। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ৪০টি কার্গোর মধ্যে ২৬টি সরবরাহের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। অর্থাৎ মোট চুক্তির ৬৫ শতাংশ পূরণ করতে পারবে তারা।

কাতারএনার্জির সহযোগী প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি ট্রেডিং এলএলসি থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলএনজি পাওয়ার কথা রয়েছে। ২৪টি কার্গোর চুক্তির বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি ১৮টি সরবরাহ করবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা চুক্তির ৭৫ শতাংশ। দুই প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে আগামী বছর কাতারের কাছ থেকে মোট ৪৪টি কার্গো পেতে পারে বাংলাদেশ।

তবে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় কাতারএনার্জি ফোর্স ম্যাজিউর ঘোষণা করেছে। এর ফলে চুক্তি অনুযায়ী পূর্ণ ৪০টি কার্গো পাওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও সরবরাহ কমে আসছে।

অন্যদিকে, ওমানের রাষ্ট্রায়ত্ত এলএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওকিউ ট্রেডিংয়ের (ওকিউটি) কাছ থেকেও ২০২৭ সালে ৩২টি কার্গো পাওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কোনো কার্গোর সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি। বরং চুক্তির অর্ধেক, অর্থাৎ ১৬টি কার্গো সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে তারা।

ওকিউটির প্রস্তাবে মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি পরিবর্তনের বিষয়টিও রয়েছে। বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দামের সঙ্গে সম্পর্কিত পদ্ধতির পরিবর্তে জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) সূচক অনুসারে এলএনজির দাম নির্ধারণ করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। এ ক্ষেত্রে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটের (এমএমবিটিইউ) দাম জেকেএম সূচকের চেয়ে ০.০৪ ডলার কম রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে এ প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি পেট্রোবাংলা। প্রতিষ্ঠানটিকে বিদ্যমান চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সরবরাহ অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত মার্চে সরবরাহ সংকট শুরুর পর থেকেই ফোর্স ম্যাজিউর ঘোষণা দিয়ে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রেখেছে ওকিউটি।

গানভর ও টোটালএনার্জিসের কাছ থেকে আসবে ১৮ কার্গো
কাতার ও ওমানের বাইরে অন্যান্য সরবরাহকারীর কাছ থেকেও এলএনজি সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশের। এর অংশ হিসেবে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান গানভর ইউএসএ এলএলসি থেকে ২০২৭ সালে ছয়টি কার্গো পাওয়ার কথা রয়েছে।

২০২৬ থেকে ২০৩৮ সালের মধ্যে মোট ১১৭টি কার্গো সরবরাহের লক্ষ্যে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ১৩ বছর মেয়াদি চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। চুক্তির প্রথম পর্যায়ে ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে জেকেএম সূচকভিত্তিক মোট ১৪টি কার্গো সরবরাহ করবে গানভর। এর মধ্যে ২০২৬ সালে পাঁচটি, ২০২৭ সালে ছয়টি এবং ২০২৮ সালে তিনটি কার্গো পাওয়ার কথা রয়েছে। ২০২৭ সালের ছয়টি কার্গোর প্রতি এমএমবিটিইউর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে জেকেএম সূচকের সঙ্গে অতিরিক্ত ০.০৮৭৫ ডলার যোগ করে।

চুক্তির অবশিষ্ট ১০৩টি কার্গো ২০২৮ থেকে ২০৩৮ সালের মধ্যে সরবরাহ করা হবে। এসব কার্গোর মূল্য নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের হেনরি হাব সূচকের ১২১ শতাংশের সঙ্গে ৫.২০ ডলার যোগ করার শর্ত রাখা হয়েছে।

এদিকে, ফ্রান্সভিত্তিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান টোটালএনার্জিসের কাছ থেকে ২০২৭ সালে ১২টি কার্গো পাওয়ার প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত মোট ১৮টি কার্গো সরবরাহের জন্য প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সম্প্রতি স্বল্পমেয়াদি চুক্তি হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম হবে জেকেএম সূচকের সঙ্গে অতিরিক্ত ০.০৬ ডলার যোগ করে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এক্সেলেরেট গ্যাসের কাছ থেকে ২০২৭ সালে ১৪টি কার্গো পাওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত নয়টির সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, রিগ্যাসিফিকেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর প্রতিটি এলএনজি কার্গো থেকে প্রায় ২ হাজার ৯০০ থেকে ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়া যায়।

স্পট মার্কেটনির্ভরতায় বাড়ছে ভর্তুকির চাপ
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। স্পট মার্কেটে তুলনামূলক বেশি দামে গ্যাস কিনতে হওয়ায় আমদানি ব্যয়ও বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ের ওপর।

জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকি হিসেবে সরকারের ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতা এবং সরবরাহ সংকটের মধ্যে দেশের গ্যাসের চাহিদা মেটাতে গিয়ে এ বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে সরকারকে।

এ অবস্থায় আপাতত আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত এলএনজি আমদানির সূচি নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে মিল রেখে সরবরাহকারীদের প্রতিশ্রুতি ও দেশের আমদানির প্রয়োজনীয়তা নতুন করে পর্যালোচনা করতে পারবে পেট্রোবাংলা।

Share this news as a Photo Card