নিউইয়র্ক ০৭:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৪ বছরেও খুনিরা চিহ্নিত হয়নি, জানা যায়নি মোটিভ

  • আপডেটের সময় : ১১:৪০:১৬ পূর্বাহ্ণ, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
  • ২ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

১৪ বছর আগে ঢাকার নিজ বাসায় নির্মমভাবে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি। তিনটি সংস্থা ঘুরে গত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সর্বশেষ তদন্তের দায়িত্ব পায় টাস্কফোর্স। দুই বছর ধরে তদন্ত করেও টাস্কফোর্স চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের কোনো কুলকিনারা করতে পারেনি। এমনকি দীর্ঘ তদন্তেও এই হত্যাকাণ্ডের মোটিভ এবং হত্যাকাণ্ডে কে বা কারা জড়িত তা সুনির্দিষ্ট করা যায়নি।

তবে গত আগস্ট মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার এক বক্তব্যে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নাটকীয় মোড় নেয়। যেখানে ঐ প্রসিকিউটর দাবি করেন, তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিটের দায়িত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তা মে. জে. জিয়াউল আহসান ও একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। জিয়াউল আহসানের একজন সহকারীকে জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাংবাদিক দম্পতি হত্যার তদন্তে কী তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন তা পাওয়ার জন্য চিফ প্রসিকিউটরকে চিঠি দিয়েছে পিবিআই। চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় জানিয়েছে তাদের তদন্তকাজ সম্পন্ন হলে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত টাস্কফোর্সের তদন্তকারীর নিকট হস্তান্তর করা হবে জানিয়েছে।

তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল : এদিকে গতকাল মঙ্গলবার এই হত্যা মামলার ২৭ পৃষ্ঠা সম্বলিত তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করে টাস্কফোর্স। প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত সম্পন্ন করতে এক বছর সময় চায় টাস্কফোর্স। শুনানি নিয়ে বিচারপতি সিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ ছয় মাস সময় মঞ্জুর করেছেন। একইসঙ্গে আগামী ২৯ এপ্রিল তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য করেছেন। ঐ দিন প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহাকে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। এর আগে টাস্কফোর্স উচ্চ আদালত থেকে ছয় মাস করে তিন দফা সময় নেন। কিন্তু এখনো তদন্তের কোনো কুলকিনারা করতে পারেননি।

গতকাল দাখিল করা তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে এমন অনেক তথ্যের দেখা মিলেছে যেগুলো অতীতে দাখিল করা অগ্রগতি প্রতিবেদনে ছিল। অগ্রগতি প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হাইকোর্টে পড়ে শোনান রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। বাদীপক্ষে ছিলেন আইনজীবী শিশির মনির। পরে সংবাদ সম্মেলনে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত সেটা নিয়ে সরকারের গোপন করার কিছু নাই। কাউকে রক্ষা করারওকাজ নাই। ২০১২ সালে যে সরকার ক্ষমতায় ছিল তাদের সম্পর্কে অনেক কিছু শোনা যেত। সেজন্য সবাই চাচ্ছে সুষ্ঠু তদন্তের মধ্য দিয়ে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসুক। তিনি বলেন, তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা এই মামলার তদন্তে ছিলেন তাদের অনেককেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে একটা ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে।

সাগর–রুনিকে হত্যার সময় তাড়াহুড়ো করেনি খুনিরা :অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারিবারিক বা দাম্পত্য কলহের কারণে খুন হননি সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। তারা একজনকে হত্যার পর অপরজন আত্মহত্যা করেছেন এমন প্রমাণও পাওয়া যায়নি। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে তাদের দুই জনকেই হত্যা করা হয়েছে। ক্রাইমসিন এবং ভিকটিমের ক্ষতের পরিমাণ দেখে বোঝা যায় যে খুনিরা হত্যাকাণ্ড সংঘটনে তাড়াহুড়া করেনি।

টাস্কফোর্স বলেছে, লুষ্ঠিত মোবাইল ফোন সেট ও দুইটি ল্যাপটপ আজ পর্যন্ত উদ্ধার করা যায় নাই। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট তত্কালীন আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, মিডিয়া মুখপাত্র ডিএমপি ডিবি প্রধান মনিরুল ইসলাম, র‍্যাব মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমানগণকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাওয়া যায় নাই। সাবেক স্বরাষ্টমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা যায় নাই। একজন সাংবাদিককে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে। উল্লিখিত ব্যক্তিগণকে তদন্তের স্বার্থে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হয়তো বা মামলার গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য কিংবা দিক নির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে।

খুনিরা পেশাদার ছিল না : অগ্রগতি প্রতিবেদনে বিশেষ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে টাস্কফোর্স। এতে বলা হয়েছে, লাশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায় যে সাগর বা রুনি উভয়ের শরীরে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে উল্লেখযোগ্য আঘাতের অস্তিত্ব নেই। পেশাদার খুনির অপরাধের সঙ্গে যা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভিকটিমদের দেহে অনেকগুলো ক্ষত ছিল যা অধিক রক্ত ক্ষরণের জন্য দায়ী। তবে প্রতীয়মান হয় যে ভিকটিম মৃত্যুর পূর্বে অনেকক্ষণ ক্ষতসহ জীবিত ছিল। ঘাড়ে এবং পিঠে, চোখের নিচে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

শরীরে চেতনানাশক পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি:টাস্কফোর্স বলছে, মামলাটি তদন্তকালে পূর্ববর্তী তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ ১৬৭ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করেন। আমার তদন্তকালে ৯০ জন সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ২৪ জনের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা হয়। পূর্ববর্তী তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ মামলায় সন্দেহভাজন আট জন আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করে। মামলার ঘটনায় সম্পৃক্ত মোট ৪৭টি বিভিন্ন ধরনের আলামত জব্দ করা হয়। সাগর ও রুনির লাশের ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যালে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু নিহতদের ভিসেরা সংরক্ষণ না করায় পরবর্তী সময় আদালতের অনুমতিক্রমে লাশ কবর থেকে উত্তোলনপূর্বক পুনরায় ভিসেরা সংরক্ষণ ও ফুসফুস, লিভার ও পাকস্থলিতে চেতনানাশক পদার্থের অস্তিত্ব ছিল কি না তা পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিক্যালে প্রেরণ করেন। প্রাপ্ত ভিসেরা রিপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, চেতনানাশক পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

ডিএনএ পরীক্ষায় দুই জন পুরুষ কারা উদ্ঘাটন করা যায়নি:প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত ছুরি, বঁটি, ছুরির বাট এবং সাগর ও রুনির পরিধেয় বস্ত্রাদিসহ অন্যান্য আলামত ও ২৫ জন ব্যক্তির বুকাল সোয়াব (মুখের ভেতরের কোষ থেকে ডিএনএ সংগ্রহ) সংগ্রহপূর্বক ডিএনএ পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং নেদারল্যান্ডের ল্যাবে প্রেরণ করা হয়। আলামতে প্রাপ্ত ডিএনএর সঙ্গে প্রেরিত ব্যক্তিদের ডিএনএ ম্যাচিং হয়নি বলে ডিএনএ ল্যাব কর্তৃক প্রেরিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ল্যাব প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঘটনাস্থলে চার জন ব্যক্তির ডিএনএ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তিন জন পুরুষ ও এক জন নারী। তিন জন পুরুষের মধ্যে এক জন সাগর সারওয়ার এবং এক জন নারী মেহেরুন রুনির বলে শনাক্ত হয়। বাকি দুই জন অজ্ঞাত পুরুষ, এরা কারা তা উদ্ঘাটন করা যায়নি।

এছাড়া, আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসা থেকে উদ্ধার করা প্রায় ৩০০টি সিডিতে বিভিন্ন ধরনের তথ্য, কথোপকথন, ভিডিও, অডিও ও অপরাধ সংক্রান্ত উপাত্ত থাকতে পারে। এর মধ্যে ৯০টির মূল্যায়ন করা হয়েছে। বাকি ২১০টি সিডি পর্যালোচনা এখনো শেষ হয়নি।

প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারে ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর ও রুনি। পরদিন ভোরে তাদের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। ঐদিনই রুনির ভাই নওশের আলী রোমান বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। শেরেবাংলা নগর থানা চার দিন তদন্ত করে। পাঁচ দিন পর মামলাটির তদন্ত যায় ডিবির হাতে। ৬৩ দিন তদন্ত করে ডিবি। এরপর এক রিট মামলার পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের আদেশে তদন্তভার যায় র্যাবের হাতে। ২০১২ সালের ১৯ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর পর্যন্ত টানা ১২ বছর ৬ মাস ১৬ দিন তদন্ত করে র্যাব। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হাইকোর্টের আদেশে মামলার তদন্ত যায় টাস্কফোর্সের হাতে। টাস্কফোর্সের আহ্বায়কের দায়িত্বে রয়েছেন পিবিআই প্রধান। সদস্য হিসেবে সিআইডি, র্যাব ও পুলিশ সদরদপ্তরের একজন করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়েছেন।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

স্পেনে দুই দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত অন্তত ৪৬

ব্রাজিলের পাসপোর্ট বাতিলের পর যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছালেন ফ্লাভিও বলসোনারো

২৮ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

১৪ বছরেও খুনিরা চিহ্নিত হয়নি, জানা যায়নি মোটিভ

আপডেটের সময় : ১১:৪০:১৬ পূর্বাহ্ণ, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

১৪ বছর আগে ঢাকার নিজ বাসায় নির্মমভাবে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি। তিনটি সংস্থা ঘুরে গত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সর্বশেষ তদন্তের দায়িত্ব পায় টাস্কফোর্স। দুই বছর ধরে তদন্ত করেও টাস্কফোর্স চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের কোনো কুলকিনারা করতে পারেনি। এমনকি দীর্ঘ তদন্তেও এই হত্যাকাণ্ডের মোটিভ এবং হত্যাকাণ্ডে কে বা কারা জড়িত তা সুনির্দিষ্ট করা যায়নি।

তবে গত আগস্ট মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার এক বক্তব্যে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নাটকীয় মোড় নেয়। যেখানে ঐ প্রসিকিউটর দাবি করেন, তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিটের দায়িত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তা মে. জে. জিয়াউল আহসান ও একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। জিয়াউল আহসানের একজন সহকারীকে জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাংবাদিক দম্পতি হত্যার তদন্তে কী তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন তা পাওয়ার জন্য চিফ প্রসিকিউটরকে চিঠি দিয়েছে পিবিআই। চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় জানিয়েছে তাদের তদন্তকাজ সম্পন্ন হলে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত টাস্কফোর্সের তদন্তকারীর নিকট হস্তান্তর করা হবে জানিয়েছে।

তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল : এদিকে গতকাল মঙ্গলবার এই হত্যা মামলার ২৭ পৃষ্ঠা সম্বলিত তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করে টাস্কফোর্স। প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত সম্পন্ন করতে এক বছর সময় চায় টাস্কফোর্স। শুনানি নিয়ে বিচারপতি সিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ ছয় মাস সময় মঞ্জুর করেছেন। একইসঙ্গে আগামী ২৯ এপ্রিল তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য করেছেন। ঐ দিন প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহাকে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। এর আগে টাস্কফোর্স উচ্চ আদালত থেকে ছয় মাস করে তিন দফা সময় নেন। কিন্তু এখনো তদন্তের কোনো কুলকিনারা করতে পারেননি।

গতকাল দাখিল করা তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে এমন অনেক তথ্যের দেখা মিলেছে যেগুলো অতীতে দাখিল করা অগ্রগতি প্রতিবেদনে ছিল। অগ্রগতি প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হাইকোর্টে পড়ে শোনান রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। বাদীপক্ষে ছিলেন আইনজীবী শিশির মনির। পরে সংবাদ সম্মেলনে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত সেটা নিয়ে সরকারের গোপন করার কিছু নাই। কাউকে রক্ষা করারওকাজ নাই। ২০১২ সালে যে সরকার ক্ষমতায় ছিল তাদের সম্পর্কে অনেক কিছু শোনা যেত। সেজন্য সবাই চাচ্ছে সুষ্ঠু তদন্তের মধ্য দিয়ে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসুক। তিনি বলেন, তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা এই মামলার তদন্তে ছিলেন তাদের অনেককেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে একটা ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে।

সাগর–রুনিকে হত্যার সময় তাড়াহুড়ো করেনি খুনিরা :অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারিবারিক বা দাম্পত্য কলহের কারণে খুন হননি সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। তারা একজনকে হত্যার পর অপরজন আত্মহত্যা করেছেন এমন প্রমাণও পাওয়া যায়নি। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে তাদের দুই জনকেই হত্যা করা হয়েছে। ক্রাইমসিন এবং ভিকটিমের ক্ষতের পরিমাণ দেখে বোঝা যায় যে খুনিরা হত্যাকাণ্ড সংঘটনে তাড়াহুড়া করেনি।

টাস্কফোর্স বলেছে, লুষ্ঠিত মোবাইল ফোন সেট ও দুইটি ল্যাপটপ আজ পর্যন্ত উদ্ধার করা যায় নাই। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট তত্কালীন আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, মিডিয়া মুখপাত্র ডিএমপি ডিবি প্রধান মনিরুল ইসলাম, র‍্যাব মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমানগণকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাওয়া যায় নাই। সাবেক স্বরাষ্টমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা যায় নাই। একজন সাংবাদিককে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে। উল্লিখিত ব্যক্তিগণকে তদন্তের স্বার্থে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হয়তো বা মামলার গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য কিংবা দিক নির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে।

খুনিরা পেশাদার ছিল না : অগ্রগতি প্রতিবেদনে বিশেষ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে টাস্কফোর্স। এতে বলা হয়েছে, লাশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায় যে সাগর বা রুনি উভয়ের শরীরে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে উল্লেখযোগ্য আঘাতের অস্তিত্ব নেই। পেশাদার খুনির অপরাধের সঙ্গে যা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভিকটিমদের দেহে অনেকগুলো ক্ষত ছিল যা অধিক রক্ত ক্ষরণের জন্য দায়ী। তবে প্রতীয়মান হয় যে ভিকটিম মৃত্যুর পূর্বে অনেকক্ষণ ক্ষতসহ জীবিত ছিল। ঘাড়ে এবং পিঠে, চোখের নিচে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

শরীরে চেতনানাশক পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি:টাস্কফোর্স বলছে, মামলাটি তদন্তকালে পূর্ববর্তী তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ ১৬৭ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করেন। আমার তদন্তকালে ৯০ জন সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ২৪ জনের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা হয়। পূর্ববর্তী তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ মামলায় সন্দেহভাজন আট জন আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করে। মামলার ঘটনায় সম্পৃক্ত মোট ৪৭টি বিভিন্ন ধরনের আলামত জব্দ করা হয়। সাগর ও রুনির লাশের ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যালে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু নিহতদের ভিসেরা সংরক্ষণ না করায় পরবর্তী সময় আদালতের অনুমতিক্রমে লাশ কবর থেকে উত্তোলনপূর্বক পুনরায় ভিসেরা সংরক্ষণ ও ফুসফুস, লিভার ও পাকস্থলিতে চেতনানাশক পদার্থের অস্তিত্ব ছিল কি না তা পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিক্যালে প্রেরণ করেন। প্রাপ্ত ভিসেরা রিপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, চেতনানাশক পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

ডিএনএ পরীক্ষায় দুই জন পুরুষ কারা উদ্ঘাটন করা যায়নি:প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত ছুরি, বঁটি, ছুরির বাট এবং সাগর ও রুনির পরিধেয় বস্ত্রাদিসহ অন্যান্য আলামত ও ২৫ জন ব্যক্তির বুকাল সোয়াব (মুখের ভেতরের কোষ থেকে ডিএনএ সংগ্রহ) সংগ্রহপূর্বক ডিএনএ পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং নেদারল্যান্ডের ল্যাবে প্রেরণ করা হয়। আলামতে প্রাপ্ত ডিএনএর সঙ্গে প্রেরিত ব্যক্তিদের ডিএনএ ম্যাচিং হয়নি বলে ডিএনএ ল্যাব কর্তৃক প্রেরিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ল্যাব প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঘটনাস্থলে চার জন ব্যক্তির ডিএনএ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তিন জন পুরুষ ও এক জন নারী। তিন জন পুরুষের মধ্যে এক জন সাগর সারওয়ার এবং এক জন নারী মেহেরুন রুনির বলে শনাক্ত হয়। বাকি দুই জন অজ্ঞাত পুরুষ, এরা কারা তা উদ্ঘাটন করা যায়নি।

এছাড়া, আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসা থেকে উদ্ধার করা প্রায় ৩০০টি সিডিতে বিভিন্ন ধরনের তথ্য, কথোপকথন, ভিডিও, অডিও ও অপরাধ সংক্রান্ত উপাত্ত থাকতে পারে। এর মধ্যে ৯০টির মূল্যায়ন করা হয়েছে। বাকি ২১০টি সিডি পর্যালোচনা এখনো শেষ হয়নি।

প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারে ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর ও রুনি। পরদিন ভোরে তাদের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। ঐদিনই রুনির ভাই নওশের আলী রোমান বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। শেরেবাংলা নগর থানা চার দিন তদন্ত করে। পাঁচ দিন পর মামলাটির তদন্ত যায় ডিবির হাতে। ৬৩ দিন তদন্ত করে ডিবি। এরপর এক রিট মামলার পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের আদেশে তদন্তভার যায় র্যাবের হাতে। ২০১২ সালের ১৯ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর পর্যন্ত টানা ১২ বছর ৬ মাস ১৬ দিন তদন্ত করে র্যাব। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হাইকোর্টের আদেশে মামলার তদন্ত যায় টাস্কফোর্সের হাতে। টাস্কফোর্সের আহ্বায়কের দায়িত্বে রয়েছেন পিবিআই প্রধান। সদস্য হিসেবে সিআইডি, র্যাব ও পুলিশ সদরদপ্তরের একজন করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়েছেন।

Share this news as a Photo Card